আমার ব্যালকনি ও ছাদ বাগান

আপনি যেখানে অবস্থান করছেন তার চারপাশে তাকিয়ে দেখুন – ব্যালকনিতে, বাড়ির ছাদে, রেলিং, রুমের মধ্যে, অফিস সাঁজাতে, বাড়ির উঠানে অথবা সামান্য যায়গা পেলেই কোন না কোন গাছ লাগিয়েছে শখের বশে। এতেই বুঝা যায় আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের কৃষির প্রতি রয়েছে অধিক আগ্রহ। আগ্রহ থাকা সত্বেও শহর কেন্দ্রিক মানুষের জায়গার অভাবে গাছ লাগানো কষ্ট সাধ্য। আর ভাড়া বাসায় থাকলে তা আর অসম্ভব হয়ে পরে বাড়ির মালিকের অনুমতির কারণে। তাছাড়া মাটি, বীজ এবং আনুসাংগিক জিনিসের কারণে অনেকের আগ্রহ থাকা সত্বেও কৃষিতে অনাগ্রহের সৃষ্টি হয়।

আমিও ভাড়া বাসায় থাকা শহর কেন্দ্রিক একজন মানুষ। পেশা ফ্রিল্যান্সিং (আই.টি. প্রফেশনাল)। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকে ভালবাসলেও কৃষির সঠিক জ্ঞান নেই বললেই চলে। তবুও অতি আগ্রহের কারণে নিজ রুমের ছোট্ট বারান্দায় এবং ছাদে করেছি শাক সবজির চাষ। অল্প দিনেই ফসলে সফলতা পেয়েছি আশানুরূপ এবং সেই সাথে লাভবান হয়েছি বাহ্বিক অনেক বিষয়ে। চেষ্টা করেছি অতি স্বল্প খরচে কিভাবে সব করা যায়। তাই টব হিসেবে ব্যবহার করেছি দুই বা পাঁচ লিটারের পানি এবং তৈলের অব্যবহৃত জার। এছাড়াও আপেল বিক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি খুবই স্বল্প মূল্যে কাঠের বক্স। চারা গাছ যাতে পাখি নষ্ট না করে সে জন্য ব্যবহার করেছি কাঁচাবাজারে আনিত সবজি বোঝাই এর ফেলে দেয়া নেটের ব্যাগ। মাটির সাথে ব্যবহার করেছি মাস খানেক পঁচানো গোবর এবং তরীতরকারির জৈব সার। রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে খুবই সামান্য। খরচ কমাতে বীজ থেকেই করেছি সকল চারা গাছ। লাগিয়েছি টমাটো, মরিচ, কুমড়া শাক, করলা, বেগুন, পেঁয়াজ, ধনিয়া পাতা, ক্যাপসিকাম, মুলা শাক, বাটি শাক, ঢেঁড়স, লেটুস, লাউ, পুঁই শাক, পালং শাক, আলু, শিম, ডাটা, পুদিনা পাতা, আদামনি, ইত্যাদি।

অল্প জায়গায় স্বল্প মাটিতে গাছ লাগিয়ে ফলন পাওয়া খুব একটা সহজ নয়। তবে একটু খেয়াল করে করলে সহজই বটে। বুঝতে চেষ্টা করবেন মাটি, সার, বীজ, ঔষদ, রৌদ্র সহ প্রাকৃতিক বিষয়ের প্রভাবগুলো। নতুন হয়ে আমি করতে পারলে আপনিও পারবেন এ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে। দেখতে পাবেন ফসলের রং বেরং এর ফুলের মধু আহরণে দালানের মাঝে বেড়াতে আসা প্রজাপতি, মৌমাছি, ফড়িং, ভোমরা সহ অনেক প্রকারের সুন্দর পোকামাকড়। বাচ্চাকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন এসব কীটপ্রতঙ্গের সাথে। পাশাপাশি শেখানো হবে বিভিন্ন ফসলের নাম এবং ফলানোর প্রকৃতি। পাঠ্য বইয়ের ছবিতে এসব না দেখিয়ে বাস্তবে দেখার কারণে বাচ্চার জ্ঞান বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। বর্তমানে শত কিঃমিঃ দূরে গিয়েও যখন আবাদি ফসলের মাঠ দেখা দূরহ সেখানে নিজ বারান্দায় বাচ্চার ছোট্ট নরম হাতের ছোঁয়ায প্রতিদিনের বেড়ে উঠা ফসলাদি তৃপ্তির সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে পৌঁছায়।

কম্পিউটারের অতিরিক্ত ব্যবহার, বাসা বা অফিসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে কাজ করা, খেলার মাঠের অপর্যাপ্ততায় মোবাইল গেইমস্‌ এর প্রতি আসক্তি, দীর্ঘ সময় টিভি দেখা ইত্যাদি আমাদের নিত্ব সংগি হয়ে দ্বারিয়েছে। যা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। নিয়মিত ব্যায়াম বা কায়িকশ্রম করা আমাদের অত্যাবশ্যক। কিন্তু পর্যাপ্ত খালি মাঠ না থাকায়, ফুটপাত দখল এবং রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ির কারণে হাটাহাটি বা ব্যায়াম করাও কষ্টসাধ্য। এ অপূর্ণতা গাছগাছালি লাগানোর মাধ্যমেও পূরণ করা যায়। প্রতিদিন ১-২ ঘন্টা গাছ লাগানো এবং পরিচর্যার এ কায়িকশ্রমের মাধ্যমে শরীরের ব্যাথা বেদনা সহ বিভিন্ন সমস্যা দূর হয়ে দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা অবশ্যই অনেক বৃদ্ধি পাবে। যা কিনা ছাদ বাগানের কারণে আমার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর হয়েছে।

আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ফসলের গাছ বেশি পছন্দ করি। কেননা এতে ফুল ফল দুটোই পাওয়া যায়। ফসলের ফুল আপনাকে যেমন আন্দলিত করবে তেমনি ফলন দেখে আপনি খুশি হবেন এবং নির্ভেজাল খাদ্যের চাহিদাও মিটবে। যাদের বাড়ির আঙ্গিনায় সামান্য পরিমান জায়গা খালি আছে তারা ফেলে না রেখে অবশ্যই কিছু মৌসুমী ফসনের গাছ লাগান। যাদের বারান্দা বা ছাদে লাগানোর সুযোগ আছে তারা প্লাস্টিক এর বোতলে খুব সহজেই কিছু গাছ লাগাতে পারেন। আপনি একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন অনেক লোক আছে যারা মাটি এবং জৈবসার অল্প মূল্যে সরবরাহ করে থাকে। প্রয়োজনীয় বীজ বা চারা গাছ নার্সারী থেকে পাবেন। ফেইসবুকে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ আছে যেখানে বহু কৃষিবিদ সহ অভিজ্ঞ ব্যাক্তিবর্গ আছে যাদের সহযোগীতোয় বিনামূল্যে আপনি কৃষিভিত্তিক তথ্য উপাত্ত পাবেন। আপনার গাছের কোন সমস্যা মনে হলে ছবি তুলে গ্রুপে পোষ্ট করুন। দেখবেন কেহনা কেহ আপনার গাছের রোগের প্রতিকার বা আনুষাংগিক বিষয়ে আপনাকে সমাধান দিবে। এতে করে আপনার সহজ হয়ে যাবে ছাদ বাগান বা ব্যালকনিতে বাগান করা। আমি নিজেও Prakriti (Urban and Community Organic farming), ডিজিটাল কৃষি সেবা এবং অন্যান্য ফেইসবুক গ্রুপের সদস্য। কৃষি সম্পর্কিত কোন জ্বিগাসা এবং সমস্যা সমাধানের জন্য আমি এসব গ্রুপে প্রশ্ন করে থাকি। এসব গ্রুপের সহযোগীতায় কৃষি জ্ঞান অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সময় মতন সমস্যার সমাধান পেয়ে উপকৃত হয়েছি। গ্রুপে সম্পৃক্ত থাকার ফলে অন্যান্য সদস্যদের গাছলাগানোর নতুন নতুন আইডিয়া এবং ভিন্ন ধরণের গাছগাছালি সম্পর্কে সহজেই জানতে পেরেছি। উদাহরণ সরূপ – গ্রুপের এক সদস্যের ঘরে মাশরুম চাষের কয়েকছি ছবি দেখে মাশরুম চাষ সম্পর্কে আমার আগ্রহ জন্মায় এবং মাশরুম চাষের উপর বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করি। পরবর্তীতে এর উপর ট্রেনিং সম্পূর্ণ করে নিজের চেষ্টাতেই মাশরুম চাষ করতেও সক্ষম হয়েছি। প্রকৃতি বা অন্যান্য ফেইসবুক গ্রুপগুলো কৃষি উন্নয়নে সতিৎই কার্যকর ভূমিকা রাখে।

একটি মাত্র কাজের মাধ্যমে যদি কায়িকশ্রম বা দৈনন্দিন ব্যায়াম সম্পন্ন হয়, সন্তানকে ফুলফল ও কীটপ্রতঙ্গ দেখিয়ে বাস্তবিক জ্ঞান দান, নির্ভেজাল সবজি গ্রহণ, প্রাকৃতিক ভারসম্য রক্ষা সহ নিজের পুশে রাখা শখকে যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় তাহলে যতই সমস্যা থাকুন না কেন কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতেও দ্বিধা নেই।

CONTACT US

We're not around right now. But you can send us an email and we'll get back to you, asap.

Sending

©2020 Prakriti Farming

Log in with your credentials

Forgot your details?